মেনু বন্ধ করুন

পারাপার – হিমু সমগ্র ~ Parapar Himu Series by Humayun Ahmed

  • পারাপার হিমু সমগ্র
  • বললেন, আমি অনেকক্ষণ থেকেই দেখছি আপনি আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁটছেন। সব ঠিকঠাক তো?
    জি, সব ঠিকঠাক।
    আমার বাবা রিটায়ার পর ঠিক আপনার মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁটা অভ্যাস করলেন। ফুটপাতে হাঁটলেও একটা কথা ছিল—উনি রাস্তাও পার হতেন আকাশের দিকে তাকিয়ে। গত বৎসর রাস্তা পার হবার সময় অ্যাক্সিডেন্ট করেন। একটা ট্রাক এসে তাঁকে চ্যাপ্টা করে রেখে চলে যায়। অনেকদিন পর আবার আপনাকে দেখলাম আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে। এই অভ্যাস দূর করুন।
    জি আচ্ছা, করব।
    পথ চলবেন চোখ খোলা রেখে।
    চোখ খোলা রাখলে মনের চোখ বন্ধ হয়ে যায়।
    মনের চোখ বন্ধ থাকাই ভালো। আপনাকে কে যেন ডাকছে। ওই দেখুন গাড়ি?
    আমি এগুলাম গাড়ির দিকে। গাড়িতে যিনি বসে আছে তাঁকে চিনতে পারছি না। বিদেশী মহিলা মনে হয়—তুরস্ক-টুরস্ক হবে। অস্বাভাবিক লম্বা টানা টানা চোখ। কাঁচা হলুদের মতো গায়ের রঙ। লালচে চুল। বোরকা পরা। তবে বোরকার ভেতর থেকে মুখ বের হয়ে আছে। কালো বোরকার কারণেই বোধহয় তরুণীকে এমন অস্বাভাবিক রূপবতী লাগছে। ভদ্রমহিলার সঙ্গে কোন ভাষায় কথা বলব? ইংরেজি? সর্বনাশ হয়েছে—মনে মনে বাংলা থেকে ইংরেজি অনুবাদ করে কথা বলা—শাস্তির মতো।
    হিমু সাহেব।
    ইয়েস ম্যাডাম।
    কী করছেন?
    কিছু করছি না।
    উঠে আসুন।
    আমি ড্রাইভারের পাশে বসতে গেলাম, ভদ্রমহিলা ইশারা করলেন তাঁর সঙ্গে বসতে। আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন না? আমি মিতু।
    আমার মুখ হাঁ হয়ে গেল। এই মেয়ে যে শুধু নিজের চেহারা পাল্টে ফেলেছে তাই না—গলার স্বরও পাল্টেছে। ভারি স্বর। ইংরেজিতে একেই বোধহয় বলে ‘হাসকি ভয়েস’।
    হিমু সাহেব!
    জি।
    আমি যে আপনার পেছনে স্পাই লাগিয়ে রেখেছি সেটা কি জানেন?
    জি না, জানি না।
    স্পাই আছে। স্পাইয়ের কাজ হচ্ছে—আপনার ক্রিয়াকর্ম লক্ষ রাখা এবং আমাকে রিপোর্ট করা।
    হুঁ করছে।
    মিতু মুখের উপর বোরকা ফেলে দিল। গাড়ি মিরপুরের রাস্তা ধরে উড়ে চলছে। ব্যস্ত রাস্তা। এমন ব্যস্ত রাস্তায় ঝড়ের গতিতে গাড়ি চালাতে সাহস লাগে। ড্রাইভারের মনে হয় সেই সাহসের কিঞ্চিৎ অভাব আছে। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, ঘনঘন কাশছে। আমি বললাম, আমরা কোথায় যাচ্ছি?
    মিতু বলল, কোথাও যাচ্ছি না। ঘুরছি। অকারণে ঘোরার অভ্যাস শুধু আপনার থাকবে, অন্য কারোর থাকবে না এটা মনে করা ঠিক না। আপনার চেয়েও অনেক বিচিত্র মানুষ থাকতে পারে।
    অব্যশই পারে।
    আমার স্পাই আপনার সম্বন্ধে কী বলল জানতে চান?
    জি না। আমার কৌতূহল কম।
    আমার কৌতূহল কম না। আমার কৌতূহল অনেক বেশি—আমি এখন আপনার নাড়িনক্ষত্র জানি। হাসবেন না।
    আমি কি একটা সিগারেট ধরাতে পারি?
    পারেন।
    আমি সিগারেট ধরালাম।মিতু বলল, আপনার এই বিচিত্র জীবনযাপনের উদ্দেশ্য কী?
    কোনো উদ্দেশ্য নেই। অল্প ক’দিনের জন্যে পৃথিবীতে এসেছি, নিজের মতো করে বাস করতে চাই।
    আপনি বিয়ে করেন নি?
    জি না।
    করবেন না?
    বুঝতে পারছি না।
    কাকে বিয়ে করবেন? রূপাকে? আমি আবারো হাসলাম। মিতু কঠিন গলায় বলল, হাসবেন না। প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছি, জবাব দিন।
    জানা থাকলে জবাব দিতাম। জবাব জানা নেই।
    আপনি দেশের বাইরে কখনো গিয়েছেন?
    জি না।
    যেতে চান?
    আমি চুপ করে রইলাম। মিতু বলল, চুপ করে থাকবেন না। এই প্রশ্নের জবাব নিশ্চয়ই আপনার জানা আছে—যদি যেতে চান আমাকে বলুন, আমি আপনাকে সারা পৃথিবী ঘুরিয়ে দেখাব। মরুভূমি দেখবেন—তুন্দ্রা অঞ্চল দেখবেন।
    শর্ত কী?
    কিসের শর্ত?
    অকারণে নিশ্চয়ই আপনি আমাকে এই সুযোগ দিচ্ছেন না। শর্ত নিশ্চয়ই আছে। সেই শর্তটা কী?
    আমারও ঘুরতে ইচ্ছে করে। একা একা ঘুরতে ভালো লাগে না। একজন সঙ্গী দরকার।
    পাহারাদার?
    পাহারাদার না, সঙ্গী। বন্ধু। আপনাকে আমার পছন্দ হয়েছে। আমার কোনো বন্ধু নেই। বাবার মৃত্যুর পর আমি একা হয়ে যাব।
    আপনার বাবা মারা যাবেন না—আমি পবিত্র মানুষ খুঁজে পেয়েছি।
    সেই পবিত্র মানুষটি কে?
    আছে একজন।
    সে কি রূপা?
    হ্যাঁ রূপা। কী করে ধরলেন?
    ইনট্যুশন ক্ষমতা শুধু যে আপনারই প্রবল।
    তাই তো দেখছি।
    আপনি একবার বলেছিলেন আপনার এক পরিচিত লোক আছে যে হারোনো মানুষের সন্ধান দিতে পারে।
    হ্যাঁ বলেছিলাম—চানখাঁরপুলে থাকে—করিম।
    তাঁর কাছে আমাকে নিয়ে চলুন তো।
    এখন যাবেন?
    হ্যাঁ এখন যাব। তার ক্ষমতা কী দেখব। যদি সে সত্যি কিছু পারে তাহলে…
    তাহলে কী?
    আমার একজন হারানো মানুষ আছে। তাকে খুঁজে পাওয়া যায় কি না দেখব।
    চলুন যাই।
  • করিম তার ছাপড়ার ঘর থেকে বের হয়ে আনন্দে দাঁত বের করে ফেলল—
    আরে, হিমু ভাইজান আফনে?
    কেমন আছিস?
    ভালো আছি। আফনের দোয়।
    ব্যবসাপাতি কেমন হচ্ছে?
    ব্যবসা নাই বললেই হয়। কনটেকে একটা কাম করলাম—পুলা হারাইয়া গেছিল। পাঁচ হাজার টেকা কনটেক। বাইর কইরা দিলাম—এর পরে আর টেকা দেয় না। চইদ্দবার গেছি। কোনোবারে দেয় পঞ্চাশ, কোনোবারে কুড়ি…
    শেষে এমন গাইল দিছি—বলছি—হারামির বাচ্চা, তোর মারে আমি…..
    চুপ চুপ।
    ছরি ভাইজান, ছরি। মিসটেক হইছে—আপনের সাথে মেয়েছেলে আছে খিয়াল নাই। বোরকা পরা খালাম্মা—মাফ কইরা দিবেন। ছোটলোকের জাত—মুখের ভাষার নাই ঠিক…।
    আমি মিতুর দিকে তাকালাম। বোরকার ফাঁক দিয়ে একদৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে করিমের দিকে। কিছুই বলছে না। আমি বললাম, একটা মেয়ে হারিয়ে গেছে। পলিন নাম। তার পেনসিল বক্সটা আমার সঙ্গে আছে। মেয়েটা কোথায় আছে বল।
    বাক্সটা দেন দেহি আমার হাতে।
    আমি পেনসিল বক্স তার হাতে দিলাম। বক্স হাতে নিয়েই করিম ফিরিয়ে দিয়ে বিরস গলায় বলল, হারাইছে কই! এই মেয়ে তার মার সাথেই আছে। মেয়ে ইশকুলে পড়ে। তার গালে পোড়া দাগ আছে। ভাইজান, ঠিক বলছি না?
    হ্যাঁ, ঠিক বলেছে।
    মিতু বলল, পেনসিল ব্ক্স হাতে নিয়েই বুঝে ফেললেন?
    জে।
    কীভাবে?
    কীভাবে এইটা তো খালাম্মা জানি না। আল্লাহপাক একটা ক্ষমতা দিছে। এই ক্ষমতা বেইচ্যা খাই।
    আমার একটা লোক খুঁজে দিতে পারবেন?
    জে পারব। অবশ্যই পারব। তয় খালাম্মা কনটেকে কাম করব। টেকা পুরাটা দিবেন এডভান্স। কাম করতে না পারলে গলায় ইটের মালা দিয়া কানে ধইরা শহরে চক্কর দেওয়াইবেন। করিমের এক কথা। যার খোঁজ চান—তার নাম দিবেন, ব্যবহারী জিনিস দিবেন। ছবি থাকলে ছবি দিবেন। বাকি আল্লাহর ইচ্ছা।
    আচ্ছা, আমি আসব।
  • গাড়িতে উঠতে উঠতে বললাম, লোকটাকে কি আপনার বিশ্বাস হয়েছে?
    মিতু বলল, আপনার হয়?
    হ্যাঁ হয়। এই ক্ষমতা তার আছে। কীভাবে এই ক্ষমতা তার হয়েছে আমি জানি না। তবে হয়েছে। সে আপনার হারানো মানুষ খুঁজে দেবে। তবে…।
    তবে কী?
    যে হারিয়ে গেছে তাকে হারিয়ে যেতে দেয়াই ভালো। হারানো মানুষকে খুঁজে বের করতে নেই।
    মিতু বোধহয় কাঁদছে। বোরকায় মুখ ঢাকা বলে বুঝতে পারছি না। তবে বোরকার পরদা উঠিয়ে দিয়ে বলল, আপনি যদি আমার প্রস্তাবে রাজি থাকেন তাহলে আর হারানো মানুষ খুঁজব না। আপনি কি রাজি?
    আমি বললাম, না।
    না কেন?
    আপনার আকর্ষণী ক্ষমতা প্রবল। রূপার চেয়ে প্রবল। আমাকে এর বাইরে থাকতে হবে।
    কেন?
    আমার উপর এই হলো আদেশ।
    কার আদেশ?
    আমার বাবার। তিনি আমার নিয়তি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। মিতু যাই। মিতু জবাব দিল না।
  • আপনার নাম কি মুনশি বদরুদ্দিন তালুকদার?
    জি।
    ভালো আছেন?
    মুনশি বদরুদ্দিন জবাব দিলেন না, দরজা ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। মনে হচ্ছে আমাকে ভেতরে ঢুকতে দেয়ার তাঁর কোনো আগ্রহ নেই। আমার সঙ্গে কথাবার্তাও চালাতে চাচ্ছেন না। তালগাছের মতো লম্বা একজন মানুষ। রোগা। ক্লান্ত চেহারা। নামের সঙ্গে মুনশি থাকার কারণে ক্ষীণ সন্দেহ থাকে, হয়তো তাঁর দাড়ি আছে। ভদ্রলোকের দাড়ি নেই। আমি বললাম, আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারি?
    কেন?
    এমনি। কিছুক্ষণ কথা বলব? কোনো কারণ নেই।
    জমিজমা সংক্রান্ত কোনো কাজ?
    না। আমি আপনাকে বেশিক্ষণ বিরক্ত করব না। কিছুক্ষণ কথা বলে চলে যাব। আপনার ঠিকানা বের করতে আমার খুব কষ্ট হয়েছে। অফিস থেকে মালিবাগের একটা ঠিকানা দিয়েছিল—দেখা গেল ভুল ঠিকানা।
    শুধু শুধু আমার সঙ্গে কথা বলতে চান কেন?
    শুনেছি আপনি ঘুস খান না। কাজেই আপনার সঙ্গে দেখা করার আগ্রহ বোধ করছি।
    ঘুস তো অনেকেই খায় না।
    তাও ঠিক। সবার নাম ঠিকানা জানি না। জানলে সবার সঙ্গেই দেখা করতাম।
    কেন?
    বারবার কেন কেন জিজ্ঞেস করবেন না তো ভাই—একটু বসতে দিন।
    আমার মেয়ে খুব অসুস্থ। আপনি আরেকদিন আসুন।
    তার কী অসুখ?
    বুকে ব্যাথা।
    আজই বুকে ব্যাথা করছে, না অনেকদিনের রোগ?
    অনেকদিনের অসুখ।
    আমি শারীরিক ব্যথা কমাতে পারি। মেয়েটার কাছে আমাকে নিয়ে চলুন।
    মুনশি বদরুদ্দিনের মুখের মাংসপেশি সামান্যতমও শিথিল হলোনা। বোঝাই যাচ্ছে এ কঠিন লোক। দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে যে দাঁড়িয়েই আছে। এক মুহূর্তের জন্যেও দরজা থেকে হাত সারায় নি। আমি হাল ছেড়ে দিয়ে বললাম, আচ্ছা ভাই যাই। আরেকদিন আসব।
    সিঁড়ি দিয়ে প্রায় নেমে গেছি, তখন বদরুদ্দিন ডাকলেন, আসুন।
    আমি ঘরে ঢুকলাম। একজন সৎ মানুষের বসার ঘর যেমন হওয়া উচিত, ঘরটি তেমন। এক কোনায় কয়েকটা কাঠের চেয়ার, অন্য কোনায় বড় চৌকি। অসুস্থ মেয়েটি এই চৌকিতেই শুয়ে আছে। ১৪-১৫ বছর বয়স। মায়া-মায়া মুখ। হাত-পা এলিয়ে শুয়ে আছে। তার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। ব্যথায় ঠোঁট নীল। এই অবস্থায়ও সে আগ্রহ নিয়ে আমাকে দেখছে। আমি হাসলাম। সেও হাসার চেষ্টা করল। আমি সহজ গলায় বললাম, মেয়েটার মা কোথায়?
    দেশের বাড়িতে। বেতন যা পাই তাতে ফ্যামিলি নিয়ে ঢাকায় থাকা যায় না। আমি একটা ঘর সাবলেট নিয়ে একা থাকি।
    এই মেয়েটি কি আপনার সঙ্গে থাকে?
    একে চিকিৎসার জন্যে নিয়ে এসেছিলাম।
    চিকিৎসা হচ্ছে?
    বদরুদ্দিন চুপ করে রইলেন। আমি বললাম, আপনার মেয়ের নাম কী?
    ওর নাম কুসুম।
    আমি বসে আছি একটা চেয়ারে। বদরুদ্দিনের হাতে একটা গ্লাস এবং চামচ। গ্লাসে সম্ভবত শরবত জাতীয় কিছু আছে। তিনি চামচে করে মেয়ের মুখে শরবত দেয়ার চেষ্টা করছেন। মেয়েটা শরবত খেতে চাচ্ছে না। আমি বললাম, ভাই শুনন,আপনার মেয়েটার মনে হয় খুব কষ্ট হচ্ছে। আমার সঙ্গে গাড়ি আছে—চলুন মেয়েটাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই।
    না।
    না কেন?
    আমি কারো দয়া নেই না।
    দয়া বলছেন কেন? বলুন সাহায্য।
    আমি কারোর সাহায্যও নেই না।
    শুনন ভাই—এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে হলে সাহায্য নিতে হয় এবং সাহায্য করতে হয়। Give and take.
    আমি আপনাকে চিনি না, জানি না—কেন আপনি খামাখা বিরক্ত করছেন?
    মেয়েটা কষ্ট পাচ্ছে, আপনি তার কষ্ট কমাবার চেষ্টা করবেন না?
    আমি আমার সাধ্যমতো করেছি। যেটা আমার সাধ্যের বাইরে সেটা আমি করব না।
    বদরুদ্দিন সাহেব—সততা একসময় রোগের মতো হয়ে দাঁড়ায়। সবসময় দেখা যায় সৎ মানুষরা ভয়ানক অহঙ্কারী হয়। এরা নিজেদেরকেই শুধু মানুষ মনে করে, অন্যদের করে না।আপনি নিজে যেমন কারোর সাহায্য নেন না—আমি নিশ্চিত, আপনি কাউকে সাহায্যও করেন না। করেছেন, কাউকে কেনো সাহায্য?
    আমি আমার নিজের মতো থাকি।
    নিজের মতো থাকার জন্যে তো আপনাকে পৃথিবীতে পাঠানো হয় নি।
    আপনি কে?
    আমার নাম হিমু। বাইরে ঠাণ্ডা আছে। মেয়েটাকে একটা গরম কাপড় পরান। আমারা তাকে ভালো কোনো ক্লিনিকে নিয়ে যাব। আবার যদি না বলেন—তিনতলা থেকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেব।
    অসুস্থ মেয়েটি তার বাবাকে চমকে দিয়ে খিলখিল করে হেসে ফেলল। আমি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললাম, কুসুম, তুমি কি আমার সঙ্গে হাসপাতালে যাবে?
    হুঁ।
    তোমার ব্যথা কি এখন একটু কমেছে?
    হুঁ। আপনি কে?
    আমার নাম হিমু। ভালো নাম হিমালয়।
    মেয়েটি আবারো হেসে উঠল। মনে হচ্ছে সে অতি অল্পতেই হেসে ফেলে।
    বদরুদ্দিন গম্ভীর গলায় বললেন, হাসপাতালে কুসুমকে নিয়ে লাভ হবে না। ওর একটা অপারেশন দরকার। ডাক্তাররা বলছেন এই অপারেশন এখানে হয় না। আগে কখনো হয় নি।
    আগে হয় নি বলে কোনোদিন হবে তা তো না। এবার হবে। মেয়েটার গরম কাপড় নেই?
    বদরুদ্দিন লাল রঙের একটা সুয়েটার বের করে আনলেন। মেয়েটা আনন্দিত মুখে চুল আঁচড়াচ্ছে। মনে হচ্ছে সে কোথাও বেড়াতে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
  • তাঁকে একটা ক্লিনিকে ভর্তি করিয়ে দিলাম। বড় ক্লিনিক বলেই বোধহয় শুধু টাকারই খেলা। ভর্তি করাবার সময়ই সাতদিনের টাকা এডভান্স দিতে হয়। এই সঙ্গে ডাক্তার এবং ওষুধের বিল বাবদ দেড় হাজার টাকা।
    পকেটে আছে দুটা কুড়ি টাকার নোট। একটা পাঁচ টাকার নোট। দ্রুত টাকার যোগাড় করতে হবে। জরুরি সময়ের একমাত্র ভরসা হচ্ছে রূপা। টেলিফোনে তাকে পাওয়া গেলে হয়। ক্লিনিকের রিসিপশান থেকে টেলিফোন করতে হলেও এডভান্স টাকা দিতে হয়। শহরের ভেতর প্রতি কল পাঁচ টাকা। মানুষের রোগ নিয়ে ব্যবসা কত প্রকার ও কী কী হতে পারে তা ক্লিনিকওয়ালাদের মতো ভালো কেউ জানে না।
    হ্যালো রূপা?
    হুঁ।
    কুকুরছানাটা যে পাঠিয়েছিলাম সে কেমন আছে?
    ভালো আছে।
    পছন্দ হয়েছে তো?
    হ্যাঁ,পছন্দ হয়েছে। খুব পছন্দ হয়েছে। এটা কিন্তু নেড়ি কুকুর না। বিদেশী কুকর—পুডল।
    শুনে আনন্দি হলাম। এখন তুমি দয়া করে একটা কাজ করো—কুকুরের দাম বাবদ চার হাজার টাকা পাঠিয়ৈ দাও। আমি লোক পাঠাচ্ছি।
    লোক পাঠাতে হবে না। তুমি কোথায় আছ বলো—আমি নিজেই টাকা নিয়ে আসছি। অনেকদিন তোমাকে দেখি না। রূপা টেলিফোন নামিয়ে রাখল। রূপার এখানে আসতে আসতেও আধ ঘণ্টার মতো লাগবে। এই ফাঁকে আমি সটকে পড়ব। রূপার সঙ্গে দেখা করতে চাই না।
  • কুসুমের জায়গা হয়েছে রুম নাম্বার ৮-এ। বেশ বড় রুম। টিভি পর্যন্ত আছে। কুসুম তার শরীরের তীব্র ব্যথা অগ্রাহ্য করে তার কেবিনের সাজসজ্জা দেখছে। তার চোখে গভীর বিস্ময়।
    ডাক্তার সাহেব ব্যথা কমানোর ইনজেকশন দিয়েছেন। ডাক্তার সাহেবের মুখ শুকানো। মনে হচ্ছে ইচ্ছার বিরুদ্ধে তিনি ইনজেকশনটা দিলেন। আমি বললাম,রোগী কেমন দেখছেন ডাক্তার সাহেব
    তিনি রসকষহীন গলায় বললেন, বাইরে আসুন, বলছি।
    আমরা বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। ডাক্তার সাহেব ক্লান্ত গলায় বললেন, আপনারা লষ্ট কেইস নিয়ে এসেছেন। এই মেয়ের বাঁচার কোন আশা নেই। এর হার্ট পুরোপুরি ড্যামেজড। এ যে কীভাবে বেঁচে আছে সেটাই একটা রহস্য।
    আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, জগতটাই রহস্যময় ডাক্তার সাহেব। তবে আপনাকে একটা উপদেশ দেই। লষ্ট কেইস ধরে নিয়ে কোনো রোগীর চিকিৎসা করবেন না। চিকিৎসকরা চিকিৎসা শুরু কররেন ‘gain case ধরে, lost case’ ধরে না।
    ভেবেছিলাম আমার কথায় ডাক্তার রাগ করবেন। তিনি রাগ করলেন না। চিন্তিত মুখে আবার মেয়েটির কাছে ফিরে গেলেন।
    আমি মোটামুটি নিশ্চিত বোধ করছি। এই মেয়েটিকে নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। রূপা চলে আসছে। যা করার সে-ই করবে। টাকা না দিয়েই ক্লিনিক ছেড়ে চলে যাচ্ছি—এটা ক্লিনিকের লোক পছন্দ করছে না। একজন এসে টাকা দেবে—এই সত্য বিশ্বাস করতে তারা প্রস্তুত নয়। ম্যানেজার জাতীয় এক ভদ্রলোক বললেন, আপনি বসুন নারে ভাই। চা পানি খান। উনি আসলে চলে যাবেন। আমি বললাম, আমার কথার উপর ভরসা হচ্ছে না ?
    ছিঃ ছিঃ কী বলেন, ভরসা হবে না কেন ?
    জামিন হিসেবে একজন রোগী তো আছেই। টাকা-পয়সা নিয়ে আপনাদের সঙ্গে ঝামেলা হলে ইনজেকশন দিয়ে রোগী মেরে ফেলবেন। গেল ফুরিয়ে। মামলা ডিসমিস।
    আপনি অমানুষের মত কথা বলছেন। আপনি তো একজন ক্রিমিনাল। ঠিক বলেছেন। এখন দয়া করে অনুমতি দিন—আমাকে মুন্সিগঞ্জ যেতে হবে। মুন্সিগঞ্জের ওসি সাহেবের কাছে ধরা দিতে হবে। যেতে পারি ?
    কেউ জবাব দিল না।
    হাসপাতালের গেটের কাছে মুনশি বদরুদ্দিন দাঁড়িয়ে। তিনি আমাকে দেখলেন। কিছু বললেন না। মুখ ফিরিয়ে নিলেন। মনে হচ্ছে তিনি আমাকে পছন্দ করছেন না ।
  • মোহাম্মদ রজব খোন্দকার থানায় ছিলেন না। থানার ভেতরেই তাঁর কোয়াটার। গেলাম কোয়র্টারে। আশঙ্কা ছিল তিনি আমাকে চিনতে পারবেন না। অল্প কিছুক্ষণের পরিচয়। না পাবারই কথা। পুলিশদের স্মৃতি দুর্বল হয়। কিন্তু তিনি আমাকে চিনলেন, আনন্দিত গলায় বললেন—আরে দি গ্রেট হিমবাবু।
    চিনতে পেরেছেন?
    চিনব না মানে? মাথা কামিয়ে গর্ত বানিয়ে বসে ছিলেন। আমি ধরে নিয়ে এলাম। এরপরেও চিনব না? এখন করছেন কী ?
    কিছু না।
    হণ্টন চালিয়ে যাচ্ছেন? শহরজুড়ে হাঁটাহাঁটির বদঅভ্যাস আছে এখনো?
    কয়েকদিন হলো হাঁটছি না। গাড়ি করে ঘুরছি—
    গড়ি! গাড়ি কোথায় পেলেন? চোরাই মাল?
    চোরাই মাল না।
    অবশ্যই চোরাই মাল। ঢাকা শহরে যত গাড়ি আছে সব ব্ল্যাকমানির গাড়ি। তারপর বলুন হিমু সাহেব—আমার কাছে কী জন্যে?
    আপনি কেমন আছেন দেখতে এসেছি স্যার।
    ভালো আছি। সুখে আছি। মিরপুরে একটা জমি কিনেছি।
    ঘুস খাওয়া ধরেছেন?
    অবশ্যই ধরেছি। সকাল বিকাল সন্ধা তিন বেলা খাচ্ছি। কী ঠিক করেছি জানেন—আগামী পাঁচ বছর খাব। তারপর তওবা করব। ব্যস, আর না। বাকি জীবন আল্লাহ-খোদার নাম দিয়ে পার করে দেব। পাঁচ বছরের অপরাধ তিনি ক্ষমা করবেন। কারণ তিনি হচ্ছে রহমানুর রহিম। কত কঠিন অপরাধ ক্ষমা করে দেন—ঘুস তো সেই তুলনায় কিছুই না।
    স্যার, আপনার কাছে কলম আছে?
    কলম কী জন্যে?
    পবিত্র মানুষের একটা লিষ্ট করেছিলাম। সেখানে আপনার নাম ছিল—নামটা কেটে দেব।
    পবিত্র মানুষদের লিষ্ট ?
    হুঁ।
    নতুন কোনো পাগলামি ?
    হুঁ।
    গুড। ভেরি গুড। দু- একটা পাগল- ছাগল সংসারে না থাকলে ভালো লাগে না। হিমবাবু!
    জি স্যার ?
    রাতে আমার সঙ্গে খাওয়াদাওয়া করবেন। একজন একটা রুই মাছ দিয়ে গেছে, আট কেজি ওজন। নদীর ফ্রেশ মাছ। পোলাওয়ের চালের ভাত করতে বলেছি। পোলাওয়ের চালের ভাত, কগজি লেবু আর মাছের পেটি। দেখি মাছ কত খেতে পারেন। মাছ খেতে পারেন তো?
    জি স্যার, পারি।
    এখন সত্যি করে বলুন। আসলেই কি পবিত্র মানুষের লিষ্ট আছে?
    আছে।
    মুন্সীগঞ্জ এসেছেন আমার ব্যাপারে খোঁজখবর করবার জন্যে?
    জি।
  • গল্পের বই পিডিএফ
  • হিমু সমগ্র / সিরিজ 

    ময়ূরাক্ষী -হুমায়ূন আহমেদ

    আঙুল কাটা জগলু -হুমায়ূন আহমেদ

    আজ হিমুর বিয়ে -হুমায়ুন আহমেদ

    একজন হিমু কয়েকটি ঝিঁঝিঁ পোকা -হুমায়ুন আহমেদ

    এবং হিমু -হুমায়ুন আহমেদ

    চলে যায় বসন্তের দিন -হুমায়ুন আহমেদ

    তোমাদের এই নগরে -হুমায়ুন আহমেদ

    দরজার ওপাশে -হুমায়ুন আহমেদ

    পারাপার -হুমায়ুন আহমেদ

    সে আসে ধীরে -হুমায়ুন আহমেদ

    হলুদ হিমু কালো র‍্যাব -হুমায়ুন আহমেদ

    হিমু এবং একটি রাশিয়ান পরী – হুমায়ুন আহমেদ

    হিমু এবং হার্ভার্ড Ph.D. বল্টুভাই -হুমায়ুন আহমেদ

    হিমু মামা – হুমায়ুন আহমেদ

    হিমু রিমান্ডে -হুমায়ুন আহমেদ

    হিমু -হুমায়ুন আহমেদ

    হিমুর আছে জল -হুমায়ুন আহমেদ

    হিমুর দ্বিতীয় প্রহর -হুমায়ুন আহমেদ

    হিমুর নীল জোছনা -হুমায়ুন আহমেদ

    হিমুর মধ্যদুপুর – হুমায়ুন আহমেদ

    হিমুর রূপালী রাত্রি -হুমায়ুন আহমেদ

    হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম -হুমায়ুন আহমেদ

    আশা করি হুমায়ূন আহমেদ এর হিমু সমগ্র / সিরিজ এর গল্পের বই গুলো হবে আপনাদের অবসর সময়ের সঙ্গি। আমাদের ওয়েব সাইটে হুমায়ূন আহমেদ সহ অনেক প্রসিদ্ধ লেখকের বই পাবেন বিনা মূল্যে। তাই সব সময় আমাদের সাথে থাকুন এবং মজার মজার সব বই পড়ুন।

  • আরও দেখুন

    আপনার মন্তব্য এখানে লিখুন

    আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।