মেনু বন্ধ করুন

পারাপার – হিমু সমগ্র ~ Parapar Himu Series by Humayun Ahmed

  • পারাপার হিমু সমগ্র
  • ঢাকা শহরে রিকশাওয়ালাদের সাইকোলজি নিয়ে কেউ এখনো গবেষণা করেন নি। গবেষণা করলে মজার মজার জিনিস বের হয়ে আসত।
    মতিঝিলের কাছে আমি লাফ দিয়ে রিকশা থেকে নামলাম। রিকশাওয়ালা আবার হাসিমুখে তাকাল। সে রিকশার গতি কমাল না। যে গতিতে চালাচ্ছিল সেই গতিতেই চালাতে লাগল। আর তখনি বুঝতে পারলাম, এই রিকশাওয়ালা আমার পূর্বপরিচিত। এর নাম হাসান। হাসানের কী যেন একটা ইন্টারেস্টিং গল্প আছে। গল্পটা মনে পড়ছে না। আচ্ছা, হাসানের নামটা কি লিস্টিতে তুলব?
    আপাতত থাক, পরে কেটে দিলেই হবে। প্রসেস অব এলিমিনেশন। হারাধনের দশটি ছেলে দিয়ে শুরু হবে—শেষ হবে এক ছেলেতে।
  • বড় খালুর অফিস মতিঝিলে।
    অনেকদিন পর তাঁর অফিস ঘরে উঁকি দিলাম। ভুরভুর করে এলকোহলের গন্ধ আসছে। খালু সাহেব মনে হয় এলকোহলের মাত্রা বাড়িয়েই দিচ্ছেন। আগে অফিসে এলে গন্ধ পাওয়া যেত না। এখন যায়।
    আসব খালু সাহেব?
    আয়।
    বোঝাই যাচ্ছে তিনি প্রচুর পান করেছেন। এমনিতে তিনি আমাকে তুমি করে বলেন। মাতাল হলেই—তুই। মাতালরা অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে কথা বলতে ভালোবাসে।
    আমি ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললাম, গরমের মধ্যে স্যূট পরে আছেন কেন?
    খালু সাহেব ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন। মনে হচ্ছে আমাকে চিনতে পারছেন না।
    বসতে পারি খালু সাহেব? নাকি জরুরি কিছু করছেন?
    বোস।
    আমি বসলাম। খালু সাহেবকে বুড়োটে দেখাচ্ছে। চকচকে টাইও তাঁর বুড়োটে ভাব ঢাকতে পারছে না। আমি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্যে বললাম, ভূমিকম্প টের পেয়েছিলেন? বড় খালু ভূমিকম্পের ধার দিয়ে গেলেন না। নিচু গলায় বললেন, চা খাবি?
    হুঁ।
    তিনি যন্ত্রের মতো বেল টিপে চায়ের কথা বললেন। আমি হাসিমুখে বললাম, এলকোহলের গন্ধ পাচ্ছি।
    বড়খালু রোবটের মতো গলায় বললেন, টেবিলে বার্নিশ লাগানো হয়েছে। বার্নিশের গন্ধ পাচ্ছিস।
    ও আচ্ছা। আমি ভেবেছিলাম আপনি বোধহয় আজকাল অফিসেও চালাচ্ছেন।
    ঠিকই ভেবেছিস। ভালোমতোই চালাচ্ছি। কেউ এলে বলি—টেবিলে বার্নিশ দিয়েছি। সন্দেহ বাতিকগ্রস্ত লোকজন লজ্জা পেয়ে যায়। তুই যেমন পেয়েছিস।
    কিন্তু আপনার সঙ্গে খানিকক্ষণ কথা বলার পরই তো সবাই বুঝে যায় যে বার্নিশ টেবিলে না , আপনি বার্নিশ লাগিয়েছেন আপনার স্টমাকে।
    কেউ কিচ্ছু বোঝে না। মানুষের ইন্টেলিজেন্সকে ইনফ্লুয়েন্স করা যায়। হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স এইটাই হলো বড় ত্রুটি। বুঝতে পারছিস?
    হুঁ।
    নে চা খা। চা খেয়ে বিদেয় হয়ে যা। টাকা-পয়সা লাগবে?
    হুঁ।
    পাওয়া গেছে?
    গোটা বিশেক নাম পাওয়া গেছে। এদের মাঝখান থেকে বের করতে হবে।
    গোটা বিশেক নাম পেয়েছিস? বলিস কী! সারা পৃথিবীতে তো ২০টা নিষ্পাপ লোক নেই। স্ট্রেজ! নামগুলো পড় তো শুনি।
    পড়া যাবে না। গোপন।
    এই কুড়িটা নাম পেলি কোথায়?
    পরিচিতদের মাঝখান থেকে যোগাড় করেছি।
    ছেলে কটা, মেয়ে কটা?
    ফিফটি, ফিফটি। দশটা ছেলে, দশটা মেয়ে।
    বড় খালুকে উত্তেজিত মনে হচ্ছে। চোখ বড় বড় করে তাকাচ্ছেন। মাতাল মানুষ সহজেই উত্তেজিত হয়।
    বাই এনি চান্স—তোর খালার নাম নেই তো?
    আমি হাসলাম। সেই হাসার যে-কোনো অর্থ হতে পারে। বড় খালু সেই হাসি না-সূচক ধরে নিলেন।
    গুড। অতি পাপিষ্ঠা মহিলা। সাতটা দোজখের মধ্যে সবচে’ খারাপটায় তার স্থান হবে বলে আমার বিশ্বাস।
    তাই নাকি?
    অবশ্যই তাই। সাতটা দোজখের নাম জানিস?
    না।
    সাতটা দোজখ হলো—
    (১) জাহান্নাম
    (২) হাবিয়া
    (৩) সাকার
    (৪) হুতামাহ
    (৫) সায়ির
    (৬) জাহিম
    (৭) লাজা।
    দোজখের নাম মুখস্থ করে রেখেছেন, ব্যাপার কী?
    যেতে হবে তো ওইখানেই। কাজেই মুখস্থ করেছি।
    আপনি নিশ্চিত যে দোজখে যাবেন?
    অবশ্যই নিশ্চিত। তবে আমার স্থান সম্ভবত সাত নম্বর দোজখে হবে। সাত নম্বর দোজখ হলো ‘লাজা’। এখানে শাস্তি কম। আমার শাস্তি কমই হবে। বড় ধরনের পাপ বলতে গেলে কিছুই করি নি। যেমন ধর, মানুষ খুন করি নি।
    মানুষ খুন করেনি নি?
    না।
    মানুষ খুন করার ইচ্ছা হয়েছে কি না বলুন।
    তা হয়েছে। অনেকবার ইচ্ছা হয়েছে।
    খুন করা এবং খুন করার ইচ্ছা প্রকাশ করা তো প্রায় কাছাকাছি।
    তা ঠিক। এই জন্যেই তো আমার স্থান হবে লাজায় কিংবা জাহিমে।
    আমি পকেট থেকে খাতাটা বের করতে করতে বললাম, মজার ব্যাপার কী জানেন বড় খালু—আপনার নাম কিন্তু নিষ্পাপ মানুষেদের তালিকায় আছে।
    বলিস কী?
    বড়খালু হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলেন। মনে হচ্ছে তার মদের নেশাটা কেটে যাচ্ছে।
    দেখেতে চান?
    তুই ঠাট্টা করছিস নাকি?
    না, ঠাট্টা করব কেন?
    আমি খাতা খুলে বড় খালুর নাম দেখিয়ে দিলাম। তিনি থ হয়ে বসে আছেন। টেবিলের উপর রাখা পানির গ্লাসের পানি এক চুমুকে শেষ করে দিলেন।
    বড় খালু যাই?
    তিনি হ্যাঁ না কিছুই বললেন না। খকখক করে কাশতে লাগলেন। ভয়াবহ কাশি। মনে হচ্ছে কাশির সঙ্গে ফুসফুসের অংশবিশেষ উঠে আসবে। আমি তাঁর কাশি থামার জন্যে অপেক্ষা করছি। একটা লোক প্রাণপণে কাশছে, এই অবস্থায় তাঁকে ফেলে চলে যাওয়া যায় না।
    হিমু!
    জি।
    তুই সত্যি তাহলে আমার নাম তোর লিস্টে তুলেছিস?
    হুঁ।
    নামটা খচ করে কেটে ফেল। তুই একটা কাজ কর। পাপীদের একটা লিস্ট কর। সেই লিস্টের প্রথম দিকে আমার নাম লিখে রাখ—In block letters.
    আপনি চাইলে করব।
    করব না—Do it. এক্ষুণি কর, এই নে কাগজ।
    পরে এক সময় লিখে নেব।
    নো, এক্ষুণি করতে হবে। রাইট নাউ।
    বড় খালু হুঙ্কার দিলেন, হুঙ্কারের শব্দে সচকিত হয়ে তাঁর খাস বেয়ারা পর্দার আড়াল থেকে মাথা বের করল। বড় খালু বললেন—ভাগো। মারেগা থাপ্পড়….।
    বাঙালি মাতাল যখন হিন্দি বলতে থাকে তখন বুঝতে হবে অবস্থা শোচনীয়। এদের ঘাঁটাতে নেই। আমি দ্রুত পাপীদের একটা তালিকা তৈরি করলাম। এক দুই তিন করে দশটা নম্বর বসিয়ে চার নম্বরে বড় খালুর নাম লিখে কাগজটা তাঁর দিকে বাড়িয়ে ধরলাম।
    চার নম্বর কী মনে করে লিখলি? কেটে এক নম্বরে দে। আমার কথা তুই কি আমার চেয়ে বেশি জানিস…গাধা কোথাকার! গিদ্ধর কি বাচ্চা, son of গিদ্ধর।
    আমি দেরি করলাম না—তৎক্ষাণ তাঁর নাম কেটে এক নম্বরে নিয়ে গেলাম।
    এখন আরেকটা নাম লেখ—মুনশি বদরুদ্দিন।
    ক নম্বরে লিখব?
    এই লিস্টে না—পুণ্যবানদের লিস্টে।
    মুনশি বদরুদ্দিন একজন পুণ্যবান ব্যক্তি?
    হ্যাঁ, এই লোক হলো পূর্ত মন্ত্রণালয়ের একজন ক্লার্ক। এক পয়সা ঘুস খায় না। পূর্ত মন্ত্রণালয়ের র্ক্লাক কিন্তু ঘুস খায় না—চিন্তা করেছিস কত বড় ব্যাপার?
    পূর্ত মন্ত্রণালয়ের র্ক্লাকদের কি ঘুস খেতেই হয়?
    অবশ্যই খেতে হয়। দৈনিক খাদ্য গ্রহণের মতো খেতে হয়। তুই ওই লোকের কাছে যাবি। তার পা ছুঁয়ে সালাম করবি। পুণ্যবানদের স্পর্শ করলে মন পবিত্র হয়।
    মুনশি বদরুদ্দিন?
    মুনশি বদরুদ্দিন তালুকদার। সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট। বেঁটেখাটো লোক। খুব পান খায়।
    আমি তাহলে উঠি বড় খালু?
    আরেকটু বোস। তোর সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগছে।
    মুনশি বদরুদ্দিন সাহেবের কাছে একটু যাব বলে ভেবেছি…।
    যাব বললেই তো যেতে পারবি না। সেক্রেটারিয়েটে ঢুকবি কী করে?
    পাসের ব্যবস্থা করতে হবে। টেলিফোনে তোর পাসের ব্যবস্থা করে দি—চা খাবি আরেক কাপ?
    না।
    মাতালরা অন্যে কী বলছে তা শোনে না। তার কাছে শুধু নিজের কথাই সত্য। বড় খালু হুঙ্কার দিয়ে বললেন, ঐ, চা দিতে বললাম না। তিনি টেবিলের কাবার্ড খুলে—সাদা রঙের চ্যাপ্টা বোতল খুলে এক ঢোঁক তরল পদার্থ মুখে ঢেলে নিলেন। সঙ্গে সঙ্গে গিলে ফেললেন না। কুলকোচার মতো শব্দ করতে লাগলেন। ভালো জিনিস চট করে গিলে ফেলতে তাঁর মনে হয় মায়া লাগছে। মুখে যতক্ষণ রাখা যায় ততক্ষণই আরাম।
    হিমু
    জি বড় খালু।
    তুই কেমন আছিস?
    খুব ভালো আছি। আপনার অবস্থা তো মনে হয় কাহিল।
    আমিও ভালো আছি। সুখে আছি, আনন্দে আছি। তবে চারপাশের এখন যে অবস্থা, এই অবস্থায় আপনাআপনি আনন্দে থাকা যায় না। তরল পদার্থের কিছু সাহায্য লাগে। বুঝতে পারছিস রে গাধা? গিদ্ধর কি ছানা, বুঝলি কিছু?
    বোঝার চেষ্টা করছি।
    পারবি। তুই বুঝতে পারবি। তোর বুদ্ধিশুদ্ধি আছে। তুই যে পুণ্যবান আর পাপীদের লিস্টে করছিস—খুব ভালো করছিস। পত্রিকায় এই লিস্ট ছাপিয়ে দিতে হবে। একদিন ছাপা হবে পুণ্যবানদের তালিকা, আরেকদিন ছাপা হবে পাপীদের তালিকা।
    উঠি বড় খালু?
    এসেই উঠি উঠি করছিস কেন? সেক্রেটারিয়েটে ঢোকার পাসের ব্যবস্থা করে দি।
    বড় খালু টেলিফোন টেনে নিলেন…তাঁর কপাল খুব ঘামছে। মুখ হাঁ হয়ে আছে। টেলিফোনের ডায়ালও ঠিকমতো ঘোরাতে পারছেন না। তিনি ডায়াল ঘোরাচ্ছেন আর মুখে বলছেন—হ্যালো। হ্যালো।
  • মুনশি বদরুদ্দিন তালুকদারকে পাওয়া গেল না। তিনি দুদিন ধরে আসছেন না। আমি তাঁর বাসার ঠিকানা চাইলাম। অফিসের একজন মধুর গলায় বললেন, ঠিকানা দিয়ে কী করবেন?
    একটু কাজ ছিল।
    কী কাজ বলুন। দেখি আমরা করতে পারি কি না।
    উনার সঙ্গেই আমার কাজ ছিল।
    উনার সঙ্গে কাজ থাকলে তো উনার কাছে যাবেন। বসুন না, দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
    আমি বসলাম। ভদ্রলোক নিচু গলায় বললেন, সিগারেটের বদঅভ্যাস আছে?
    খাই মাঝেমধ্যে।
    মাঝেমধ্য খাওয়াই ভালো। বিরাট খরচের ব্যাপার। স্বাস্থ্য নষ্ট। পরিবেশ নষ্ট। নেন সিগ্রেট নেন।
    তিনি শার্টের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করলেন। বেনসন এড হেজেস। সত্তর টাকা করে প্যাকেট। এই কেরানি ভদ্রলোক বেতন কত পান? হাজার তিনকে? তিনি খান বেনসন। ভদ্রলোজ নিজেই লাইটার দিয়ে সিগারেট ধরিয়ে দিলেন। সেই লাইটারও কায়দার লাইটার। যতক্ষণ জ্বলে ততক্ষণ বাজনা বাজে। ভদ্রলোক বললেন, কাজটা কি মিউটেশন? বড়ই জটিল কাজ। এই দপ্তরের সব কাজই জটিল। জমিজমা বিষয়-সম্পত্তির কাজ। মানুষের কোনো মূল্য নাই—জমির মূল্য আছে—বুঝলেন কিছু?
    আমি বুঝদারের মতো মাথা নাড়লাম।
    এক একটা নামজারির কাজ দেড় বছর-দুবছর ঝুলে থাকে।
    নামজারি ব্যাপারটা কী?
    নামজারি বুঝলেন না? মনে করুন, আপনি কিছু জমি কিনলেন। যার কাছ থেকে কিনলেন সরকারি রেকর্ডে আছে তার নাম। এখন তার নাম খারিজ করে আপনার নাম লিখতে হবে। এইটাই নামজারি।
    একজনের নাম কেটে আরেকজনের নাম লিখতে দেড় বছর লাগে?
    দেড় বছর তো কম বললাম। মাঝে মাঝে দুই-তিন বছরও লাগে। নাম খারিজ করা তো সহজ ব্যাপার না।
    এটাকে সহজ করা যায়?
    কীভাবে সহজ করবেন?
    সবার নাম খারিজ করে দিন। এক্কেবারে লাল কালি দিয়ে খারিজ করে জমির মূল মালিকের নাম লিখে দিন।
    ভদ্রলোক হতভম্ব গলায় বললেন, জমির মূল মালিক কে?
    যিনি জমি সৃষ্টি করেছেন তিনিই মূল মালিক।
    সবার নাম কেটে আল্লাহর নাম লিখতে বলছেন?
    জি।
    আপনার কি ব্রেইন ডিফেক্ট?
    কিছুটা ডিফেক্ট। দেখুন ভাই সাহেব, পৃথিবীর জমি আমরা ভাগাভাগি করে নিয়ে নিয়েছি, নামজারি করছি! জোছনা কিন্তু ভাগাভাগি করে নেই নি। এমন কোনো সরকারি অফিস নেই যেখানে জোছনার নামজারি করা হয়, একজনের জোছনা আরেকজন কিনে নেয়।
    ভদ্রলোক আমার কথায় তেমন অভিভূত হলেন না। পাগলদের মজার মজার কথায় কেউ অভিভূত হয় না, বিরক্ত হয়। তিনি একটা ফাইল খুলতে খুলতে বললেন, আপনি এখন যান। কাজ করতে দিন। অফিস কাজের জায়গা। আড্ডা দেয়ার জায়গা না।
    একটা সিগারেট দিন। সিগারেট খেয়ে তারপর যাই।
    তিনি এমনভাবে তাকালেন যেন অদ্ভুত কথা তিনি এই জীবনে শোনেন নি। আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, সিগারেট না খেয়ে আমি উঠব না। সিগারেট খাব। চা খাব। আর ভাই শুনুন, আমার হাতে কোনো পয়সাকড়ি নেই, আমি যে মুনশি বদরুদ্দিন তালুকদারের বাসায় যাব তার জন্যে আপ এন্ড ডাউন রিকশা ভাড়াও দেবেন।
    ভদ্রলোক চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছেন। আমি গুনগুন করছি—বিধি ডাগর আঁখি যদি দিয়েছিল তবে আমার পানে কেন পড়িল না…
    কই ভাই, দিন। সিগারেট দিন।
    ভদ্রলোক সিগারেট প্যাকেট বের করলেন।
    মুনশি সাহেবের বাসায় ঠিকানা সুন্দর করে একটা কাগজে লিখে দিন।
    উনার ঠিকানা জানি না।
    না জানলে যোগাড় করুন। আপনি না জানলেও কেউ না কেউ নিশ্চয়েই জানে। সেই সঙ্গে আপনার নিজের ঠিকানাটাও এক সাইডে লিখে দেবেন। সময় পেলে এক ফাঁকে চলে যাব। ভাই, আপনার নাম তো এখনো জানলাম না।
    চুপ থাকেন।
    ধমক দেবেন না ভাই। পাগল মানুষ। ধমক দিলে মাথা আউল হয়ে যাবে। কয়েকটা শিঙ্গাড়া আনতে বলুন তো। খিদে লেগেছে—
    কেউ কিছু বলছে না। আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি আনন্দিত গলায় বললাম, ভূমিকম্পের সময় আপনারা কে কোথায় ছিলেন?
    কথা বলবেন না চা খান।
    শিঙ্গাড়া আনতে বলুন। ঘুসের পয়সার শিঙ্গাড়া খেয়ে দেখি কেমন লাগে?
    আমি চেয়ারে বসে পা দোলাচ্ছি। অফিসের সবাই মোটামুটি হতভম্ব দৃষ্টিতে আমাকে দেখছে।
  • মুনশি বদরুদ্দিনের যে ঠিকানা তারা লিখে দিল সেই ঠিকানায় এই নামে কেউ থাকে না। কোনোদিন ছিলও না। ওরা ইচ্ছা করে একটা বদমায়েশি করেছে। তবে ওরা এখনো বোঝে নি—আমিও কচ্ছপ প্রকৃতির। কচ্ছপের মতো যা একবার কামড়ে ধরি তা আর ছাড়ি না। পূর্ত মন্ত্রণালয়ে আমি একবার না, প্রয়োজনে লক্ষবার যাব। দরকার হলে পূর্ত মন্ত্রণালয়ের বারান্দায় মশারি খাটিয়ে রাতে ঘুমাব।
    সারাদুপুর রোদে রোদে ঘুরলাম। ক্লান্ত পরিশ্রম হয়ে ঘুমোতে গেলাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। ভরদুপুরে ঘুমানোর জন্যে বাংলাদেশ সরকার ভালো ব্যবস্থা করেছেন। ধন্যবাদ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। পার্কগুলো কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে জানা নেই। জানা থাকলে ওদের একটা থ্যাংকস দেয়া যেত। গাছের নিচে বেঞ্চ পাতা। পাখি ডাকছে। এখানে-ওখানে প্রেমিক-প্রেমিকারা গল্প করছে। এরা এখন কিছুটা বেপরোয়া। ভরদুপুর হলো বেপরোয়া সময়। কেউ তাদের দেখছে কি দেখছে না তা নিয়ে মাথাব্যাথা নেই। স্কুল ড্রেসপরা বাচ্চা বাচ্চা মেয়েদেরও দেখা যায়। এরা স্কুল ফাঁকি দিয়ে আসে। একটা আইন কি থাকা উচিত না—আঠার বছর বয়স না হলে ছেলেবন্ধুর সঙ্গে পার্কে আসতে পারবে না। আইন যাঁরা করেন তাঁদের ডেকে এনে এক দুপুরে পার্কটা দেখাতে পারলে হতো।
    সেই লোক মেয়েটির গায়ের নানান জায়গায় হাত দিচ্ছে। মেয়েটি খিলখিল করে হাসছে । চাপা গলায় বলছে—এ রকম করেন কেন? সুড়সুড়ি লাগে তো।
    লোকটা ঠোঁট সরু করে বলল, আদর করি। আদর করি।
    বলতে বলতে মেয়েটাকে সে টেনে কোলে বসিয়ে ফেলল। আমি কঠিন গলায় লোকটাকে বললাম, তুই কে রে?
    কোনো ভদ্রলোককে তুই বললে তার আক্কেল গুড়ুম হয়ে যায়। কী বলবে ভাবেত ভাবতে মিনিটখানিক লেগে যায়। আমি তাকে কিছু ভাবার সুযোগ দিলাম না। হুঙ্কার দিয়ে বললাম, এই মেয়ে কে? তুই একে চটকাচ্ছিস ক্যান রে শুয়োরের বাচ্চা? তুই চল আমার সঙ্গে থানায়। আমি ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের লোক। তোদের মতো বদমায়েশ ধরার জন্যে ঘুমের ভান করে শুয়ে থাকি। মেয়েটাকে কোল থেকে নামা। নামিয়ে উঠে দাঁড়া। কানে ধর উঠ-বোস কর।
    মেয়েটাকে কোল থেকে নামাতে হলো না। সে নিজেই নেমে পড়ল এবং কাঁদার উপক্রম করল। লোকটি কী যেন বলতে গিয়ে থেমে গেল। তারপর আমার কিছু বুঝবার আগেই ছুটে পালিয়ে গেল।
    আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, এই লোক কে খুকি?
    আমার মামা।
    আপন মামা?
    উঁহুঁ।
    দূরের মামা?
    হুঁ।
    পলিন, ঐ লোকটার নাম কী?
    পলিন ফ্যাকাসে হয়ে গিয়ে বলল, আপনি আমার নাম জানেন?
    আমি তোমার নাড়ি-নক্ষত্র জান। ওই লোকটা যে বদ তা কি বুঝতে পারছ?
    পলিন ঘাড় বাঁকিয়ে রাখল। সে লোকটাকে বদ বলতে রাজি নয়।
    বুঝলে পলিন, লোকটা মহা বদ। বদ না হলে তোমাকে ফেলে পালিয়ে যেত না। বদরাই বিপদের সময় বন্ধুকে ফেলে পালিয়ে যায়।
    উনি বদ না।
    কোন ক্লাসে পড়?
    ক্লাস এইট।
    এরকম কারোর সঙ্গে যদি আর কোনোদিন দেখি তাহলে কী করব জান?
    না।
    না জানাই ভালো। যাও, এখন স্কুলে যাও—এখন থেকে তোমার উপর আমি লক্ষ রাখব। একদিন তোমাদের বাসায় চা খেতে যাব।
    আপনি কি চেনেন আমার বাসা?
    চিনি না কিন্তু তারপরেও যাব।
    আপনি কি আমার মাকে সব বলে দেবেন?
    তুমি নিষেধ করলে বলব না।
    আপনি কি আমার মাকে চেনেন?
    না।
    পলিন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তার মুখ থেকে কালো ছায়া সরে যাচ্ছে। সে খানিকক্ষণ ইতস্তত করে বলল, আমার মামাকে আপনি খারাপ ভাবছেন। উনি কিন্তু খারাপ না।
    তাই নাকি?
    উনি খুব অসাধারণ।
    বলো কী? আমার তো অসাধারণ মানুষই দরকার। ঠিক অসাধারণ নয়—পবিত্র মানুষ। আমি পবিত্র মানুষদের একটা লিস্ট করছি। তুমি কি মনে করো ঐ লিস্টে তাঁর নাম রাখা যায়?
    অবশ্যই যায়।
    তাঁর কী নাম?
    রেজা মামা। রেজাউল করিম।
    আমি পকেট থেকে লিস্ট বের করে লিখলাম—রেজাউল করিম।এখন এই পলিন মেয়েটাকে চেনা চেনা লাগছে। কোথায় যেন তাকে দেখেছি। তার ভুরু কুঁচকানোর ভঙ্গি খুব পরিচিত। পলিন চরে যাবার পর বুঝলাম, এই মেয়ে আলেয়া খালার নাতনি। মেয়েটার মার নাম খুকি।
    পলিন যেখানে বসেছিল সেখানে সে তার পেন্সিল বক্স ফেলে গেছে। বক্সটা ফিরিয়ে দিয়ে আসতে একদিন যেতে হবে ওদের বাসায়। পবিত্র মানুষ জনাব রেজাউল করিম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।
  • ইয়াকুব আলী সাহেবের ম্যানেজার মইন খান আজ স্যুট পরেছেন। আজ তাঁকে আরো সুন্দর লাগছে। বয়স কম লাগছে। গলায় লাল রঙের টাই। লাল টাইয়ে ভদ্রলোককে খুব মানিয়েছে। যারা কোনোদিন টাই পরে না তারাও এই ভদ্রলোককে দেখলে টাইয়ের দরদাম করবে।
    স্লামালিকুম মইন সাহেব।
    ওয়ালাইকুম সালাম।
    আপনি কোত্থেকে?সেই যে গেলেন আর কোনো খোঁজখবর নেই—স্যার খোঁজ করেন, আমি কিছু বলতে পারি না। আপনার মেসের ঠিকানায় দুদিন লোক পাঠিয়েছি—আপনি তো ভাই মেসে থাকেন না। কোথায় থাকেন?
    ইয়াকুব সাহেবের শরীর কেমন?
    ব্লাড ক্যানসারের রোগী—তার আবার শরীর কেমন থাকবে? যতই দিন যাচ্ছে ততই খারাপ হচ্ছে। বাইরে থেকে রক্ত দেয়া হয়েছে। আয়রনের পরিমাণ বেড়ে যায়।
    চলুন দেখা যাক।
    এখন দেখা করতে পারবেন না। স্যার ঘুমাচ্ছেন। আমার ঘরে এসে বসুন, গল্প-গুজব করুন। ঘুম ভাঙলে স্যারের কাছে নিয়ে যাব।
    আমি ম্যানেজার সাহেবের রুমে ঢুকলাম। তিনি দরজা বন্ধ করে দিলেন, গোপন কথা কিছু বলবেন কি না কে জানে!
    হিমু সাহেব।
    জি।
    দুপুরে খেয়েছেন?
    জি না, খাই নি। ঠিক করে রেখেছি দুপুরে আমি এক বান্ধবীর বাসায খাব। ওর নাম রূপা। পুরানা পল্টনে থাকে।
    স্যারের সঙ্গে দেখা না করে তো যেতে পারবেন না। এখানেই বরঞ্চ খাবার ব্যবস্থা করি। চাইনিজ রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার আনিয়ে দেই।
    জি না। রূপার ওখানে খাব ঠিক করে রেখেছি। ওখানেই যেতে হবে।

    হিমু সমগ্র / সিরিজ 

    ময়ূরাক্ষী -হুমায়ূন আহমেদ

    আঙুল কাটা জগলু -হুমায়ূন আহমেদ

    আজ হিমুর বিয়ে -হুমায়ুন আহমেদ

    একজন হিমু কয়েকটি ঝিঁঝিঁ পোকা -হুমায়ুন আহমেদ

    এবং হিমু -হুমায়ুন আহমেদ

    চলে যায় বসন্তের দিন -হুমায়ুন আহমেদ

    তোমাদের এই নগরে -হুমায়ুন আহমেদ

    দরজার ওপাশে -হুমায়ুন আহমেদ

    পারাপার -হুমায়ুন আহমেদ

    সে আসে ধীরে -হুমায়ুন আহমেদ

    হলুদ হিমু কালো র‍্যাব -হুমায়ুন আহমেদ

    হিমু এবং একটি রাশিয়ান পরী – হুমায়ুন আহমেদ

    হিমু এবং হার্ভার্ড Ph.D. বল্টুভাই -হুমায়ুন আহমেদ

    হিমু মামা – হুমায়ুন আহমেদ

    হিমু রিমান্ডে -হুমায়ুন আহমেদ

    হিমু -হুমায়ুন আহমেদ

    হিমুর আছে জল -হুমায়ুন আহমেদ

    হিমুর দ্বিতীয় প্রহর -হুমায়ুন আহমেদ

    হিমুর নীল জোছনা -হুমায়ুন আহমেদ

    হিমুর মধ্যদুপুর – হুমায়ুন আহমেদ

    হিমুর রূপালী রাত্রি -হুমায়ুন আহমেদ

    হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম -হুমায়ুন আহমেদ

    আশা করি হুমায়ূন আহমেদ এর হিমু সমগ্র / সিরিজ এর গল্পের বই গুলো হবে আপনাদের অবসর সময়ের সঙ্গি। আমাদের ওয়েব সাইটে হুমায়ূন আহমেদ সহ অনেক প্রসিদ্ধ লেখকের বই পাবেন বিনা মূল্যে। তাই সব সময় আমাদের সাথে থাকুন এবং মজার মজার সব বই পড়ুন।

  • আরও দেখুন

    আপনার মন্তব্য এখানে লিখুন

    আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।