মেনু বন্ধ করুন

পারাপার – হিমু সমগ্র ~ Parapar Himu Series by Humayun Ahmed

  • পারাপার হিমু সমগ্র
  • তোমার জানার কথা না।কোত্থেকে জানলে?
    অনুমান করে বললাম। আমার অনুমান খুব ভালো।
    তাই দেখছি।তোমার সম্পর্কে যা শুনেছি তা তাহলে মিথ্যা না।যাই হোক, আমার স্ত্রী কথা বলি—তার নাম জয়নব।সে আমার উপর মিথ্যা সন্দেহ করে আত্মহত্যা করে।মৃত্যুর পর সে তার ভুল বুঝতে পারে বলে আমার ধারণা।কারণ তারপরই সে নানানভাবে আমাকে নানানভাবে সাহায্য করতে থাকে।
    আমি বললাম, কীভাবে সাহায্য করেন? বিপদ-আপদে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেন কী করতে হবে বা না করতে হবে?
    হ্যাঁ।ঠিক ধরেছ।ব্যবসার আয়-উন্নতিও তার জন্যেই হয়েছে।তার উপদেশেই আমি ব্যবসা শুরু করি।
    ব্যাপারটা অন্য ব্যাখ্যাও তো থাকতে পারে…
    তুমি কী বলতে চাচ্ছ আমি বুঝতে পারছি।অন্য ব্যাখ্যাও আমি জানি।অন্য ব্যাখ্যা হলো—আমার অবচেতন মন আমাকে সাহায্য করছে।আমার মৃতা স্ত্রী আমার অবচেতন মনের কল্পনা।
    আপনি এই ব্যাখ্যা বিশ্বাস করেন না?
    না।
    অনেকক্ষণ কথা বলার জন্যেই সম্ভবত ইয়াকুব আলি সাহেব ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।তিনি টেবিলের উপর রাখা রিমোট কনট্রোল নবে হাত রাখলেন।নার্স ছুটে এলো।তিনি বোধহয় সাইন ল্যাংগুয়েজে কিছু বললেন—নার্স মেজারিং গ্লাসের চেয়ে একটু বড় সাইজের গ্লাসে করে কী যেন নিয়ে এলো।তিনি এক চুমুক খেয়ে চোখ বন্ধ করে থাকলেন।যতক্ষণ তিনি চোখ বন্ধ করে থাকলেন ততক্ষণ নার্স কড়া চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।চোখের ইশারায় বলল, তুমি এই অসুস্থ মানুষটাকে কেন বিরক্ত করছ? বের হয়ে যাও।
    ইয়াকুব আলি সাহেব চোখ খুলে নার্সকে আবার ইশারা করলেন।নার্স চলে গেল। তিনি চাপা গলায় বললেন, হিমু!
    জি।
    আমি অসুস্থ। ভয়াবহভাবেই অসুস্থ। মৃত্যুর ঘণ্টা ঢং ঢং করে বাজছে।তেমার তো অনুমান ভালো।বলো দেখি অসুখটা কী?
    বলতে পারছি না।আমার অনুমান সব সময় কাজ করে না।
    কতদিন বাঁচব সেটা বলতে পারবে?
    জি না।
    ইয়াকুব আলি সাহেব গলার স্বর আরো নামিয়ে ফেললেন।তাঁর কথা অস্পষ্ট হয়ে এলো। কথা বোঝার জন্যে আমাকে তাঁর দিকে এগিয়ে যেতে হলো।
    আমি শিশুদের একটা অসুখ বাধিয়ে বসেছি।এগুলো সাধারণত শিশুদের হয়।তখন তাদের বাঁচিয়ে রাখতে রক্ত বদলে দিতে হয়।কিছুদিন পর পর নতুন রক্ত।এখন কি অসুখটা বুঝতে পারছ?
    লিউকোমিয়া?
    হ্যাঁ লিউকোমিয়া।আমি প্রতি দশদিন পর পর শরীরে চার ব্যাগ করে রক্ত নিই।ডাক্তারার বলেছেন এই অসুখ থেকে উদ্ধারের কোনো আশা নেই।কিন্তু আমার স্ত্রী বলেছে উদ্ধারের আশা আছে।সে পথ দেখিয়ে দিয়েছে।
    আপনার মৃত স্ত্রী দিখেয়ে দিয়েছেন?
    হুঁ।
    পথটা কী?
    খুবই সহজ পথ, আবার এক অর্থে খুবই জটিল। তবে তুমি আমাকে সাহায্য করতে পারবে।এই জন্যেই তোমাকে খবর দিয়ে আনানো।
    পথটা কী বলুন।
    আমার স্ত্রী স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেছে, সম্পৃর্ণ নিষ্পাপ পূর্ণবয়স্ক মানুষের রক্ত যদি আমি শরীরে নিতে পারি তাহলে রোগ সেরে যাবে।ব্যাপরটা সহজ না?
    জি সহজ।
    জটিল অংশটা কী জানো? জটিল অংশ হলো—নিষ্পাপ মানুষ পাওয়া।
    আপনাকে এখন নিষ্পাপ মানুষ ধরে ধরে তাদের শরীরের সব রক্ত বের করে নিতে হবে?
    তুমি রসিকতা করার চেষ্টা করবে না হিমু।Don’t try to be funny. আমি মরতে বসেছি। যে মরতে বসে সে রসিকতা করে না।তুমি আমাকে নিষ্পাপ মানুষ যোগাড় করে দেবে।
    নিষ্পাপ মানুষ বুঝব কী করে?
    সেটা তুমি জানো, আমি জানি না। আমি খরচ দেব। টাকা যা লাগে আমি দেব।Is it clear?
    স্যার,আপনার বয়স কত হয়েছে?
    নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না। আমার বাবা-মা জন্মের দিনক্ষণ লিখে রাখেন নি। আমাকে বলেও যান নি। তবে ৫৮/৫৯ হবে।
    অনেকদিন তো বাঁচলেন।
    তা না।
    স্পষ্ট করে বলো কী বলতে চাও।
    আজ থাক। পরে বলব। আপনি ক্লান্ত। বিশ্রাম করুন।
    আমি কি আশা করতে পারি তুমি নিষ্পাপ লোক খুঁজে বেড়াবে?
    জি। আমার কাছে ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং লাগছে। কাজেই খুঁজব।
    তোমাকেও আমি খুশি করে দেব।will make. You happy. এমন খুশি করব যা তুমি চিন্তাও করতে পারবে না।
    আমি স্যার এমনিতেই খুশি।
    তোমাকে মোট বারদিন সময় দেয়া হলো।দুদিন পর আমি রক্ত নেব।যা পাওয়া যায় তাই নেব।তার দশদিন পর তোমার এনে দেয়া রক্ত নেব।
    স্যার এখন উঠি?
    যাবার পথে আমার ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলবে। টাকা-পয়সার ব্যাপার আমি সরাসরি ডিল করি না।সে ডিল করে। ওর নাম মইন।মইন খান।ভালো ছেলে।খুব ভালো ছেলে।
    নিষ্পাপ?
    ইয়াকুব আলি সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।মনে হলো খানিকটা ধাঁধায় পড়ে গেলেন।আমি বের হয়ে এলাম।ম্যানেজার মইন সাহেবকে আমার খুঁজে বের করতে হলো না।তিনি সিঁড়ির গোড়াতেই দাঁড়িয়ে ছিলেন।আমাকে সরাসরি অন্য একটা কামরায় নিয়ে গেলেন। এই কামরাটা মনে হচ্ছে ম্যানেজারের অফিসঘর। টেবিলে ফাইলপত্র সাজানো।মইন খান বসেছেন রিভলভিং চেয়ারে।
    হিমু সাহেব,বসুন।
    আমি বসলাম।মইন কৌতূহলী হয়ে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
    হিমু সাহেব।
    জি।
    আপনাকে স্যার কী দায়িত্ব দিয়েছেন, তা আমি জানি।স্যারের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে।যদিও কোন ক্ষমতায় আপনি নিষ্পাপ লোক খুঁজে বের করবেন তা বুঝতে পারছি না।
    আমি হাসলাম।আমার স্টকে অনেক ধরনের হাসি আছে।এর মধ্যে একটা ধরন হলো—মানুষকে পুরোপুরি বিভ্রান্ত করে দেয়া হাসি।মইন খান পুরোপুরি বিভ্রান্ত হলেন।তাঁর চোখমুখ শক্ত হয়ে গেল। তিনি শুকনো গলায় বললেন, আপনি কী করেন জানতে পারি কি?
    হাঁটাহাঁটি করি। আর কিছু না।আমি নগর পরিব্রাজক।
    আমি কি হেঁয়ালি ছাড়া সহজভাবে কথা বলতে পারেন না?
    সহজভাবেই বলছি।
    ভদ্রলোক রেগে গেছেন।রাগ সামলে নিয়ে সহজভাবেই বললেন, এইখানে যে এসেছেন এতে আপনার সময় নষ্ট হয়েছে।আসা-যাওয়ার একটা খরচ আছে।খরচটা দিতে চাচ্ছি।কত দেব?
    আমি চুপ করে আছি। খরচ বলতে ছয় টাকা রিকশা ভাড়া দিয়েছি।ফিরব হেঁটে হেঁটে।
    পাঁচ শ’টাকা দিলে কি আপনার চলবে?
    আমি হাসলাম।মইন খান একটা ভাউচার বের করে দিলেন।স্ট্যাম্প লাগানো ভাউচার।আমি সই করলাম।তিনি পাঁচ শ’ টাকার একটা নোট বের করে দিলেন।ঝকঝকে নোট।মনে হচ্ছে এইমাত্র টাকশাল থেকে ছাপা হয়ে এসেছে।
    এছাড়াও আপনার খরচ-পত্তর যা লাগে দেয়া হবে। কোন খাতে কত খরচ হলো—এটা জানিয়ে বিল করলেই খরচ দিয়ে দেয়া হবে। বুঝতে পারছেন?
    জি পারছি।
    মইন সাহেবের টেবিলের উপর রাখা দুটি টেলিফোনে একটি বাজছে।তিনি তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে টেলিফোন ধরলেন।বোঝাই যাচ্ছে এটা বিশেষ টলিফোন।বিশেষ বিশেষ লোকজনের জন্য।হযতো ইয়াকুব সাহেব করেছে।আমি শুধু শুনছি মইন খান জি জি করছে।অল্প খানিকক্ষণ জি জি করেই তাঁর ঘাম বেরিয়ে গেল বলে মনে হয়।তিনি টেলিফোন নামিয়ে সত্যি সত্যি রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছলেন।আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি দয়া করে আপার সঙ্গে দেখা করে যাবেন।
    কার সঙ্গে?
    আপার সঙ্গে।স্যারের মেয়ে।
    উনার কি একটাই মেয়ে?
    হ্যাঁ এক মেয়ে।বাবার অবর্তমানে এই মেয়েই সব পাবে।
    এইজন্যেই বুঝি তাঁর ভয়ে আপনি এত অস্থির?
    ম্যানেজার সাহেব অপমান গায়ে মাখলেন না।সব অপমান গায়ে মাখলে ম্যানেজারি করা যায় না।তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, চলুন, উনার কাছে নিয়ে যাই।
    উনার সঙ্গে কীভাবে কথা বলব না বলব সেই বিষয়ে কি আপনার কোনো ব্রিফিং আছে?
    না।যেভাবে ইচ্ছা কথা বলবেন।উনি থাকেন মিনেসোটায়।আর্কিটেকচারের ছাত্রী।বাবার অসুখের খবর শুনে এসেছেন।
    বিয়ে করেছেন?
    বিয়ে করেছেন কি করেন নি সেটা জানার আপনার দরকার কী?
    দরকার আছে।বিবাহিত মেয়ের সাথে একভাবে কথা বলতে হয়, অবিবাহিত মেয়ের সাথে অন্যভাবে।
    না, বিয়ে করেন নি।চলুন।
  • সূর্যের চেয়ে বালির উত্তাপ সব সময় বেশি।এই আপ্তবাক্য ইয়াকুব সাহেবের মেয়ের বেলায় খাটবে কি না বুঝতে পারছি না।মেয়েটি বাবার মতোই লম্বা। ধারালো চেহারা।সবেমাত্র গোসল করে এসেছে।বড় গোলাপি রঙের টাওয়েলে মাথা ঢাকা।কালো রঙের রোব পরেছে।বাঙালি মেয়েদর রোবে মানায় না।এই মেয়েটিকে মানিয়ে গেছে।অনেক দিন বিদেশে আছে বলেই হয়তো।
    বসুন।
    আমি বসলাম।তিনতলার বারান্দায় বেতের চেয়ার—টেবিল সাজানো।মেয়েটি বসল না।দাঁড়িয়ে রইল।চুল ভেজা নিয়ে মেয়েরা বোধহয় বসতে পারে না।রূপাকেও দেখেছি যতক্ষণ চুল ভেজা ততক্ষণই সে দাঁড়িয়ে।
    শুনেছি, বাবা আপনার উপর একটা কঠিন দায়িত্ব দিয়েছেন।
    একটা দায়িত্ব পেয়েছি। কঠিন কি না এখনো জানি না।
    বাবা যে খুবই হাস্যকর একটা ব্যাপার করতে যাচ্ছেন সেটা কি আপনার মনে হচ্ছে না?
    মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ালে আমাদের মাথার ঠিক থাকে না। সেই সময় কোনো কিছুই হাস্যকর থাকে না।
    খুবই সত্যি কথা। মৃত্যু ভয়াবহ ব্যাপার। এর মুখোমুখি হলে মাথা এলোমেলো হয়ে যাবারই কথা। কিন্তু অন্যদের কি উচিত সেই এলোমোলো মাথার সুযোগ গ্রহণ করা?
    আপনি আমার কথা বলছেন?
    জি, আপনার কথাই বলছি। সরি, আপনাকে সরাসরি কথাটা বললাম। আমি সরাসরি কথা বলি এবং আমি আশা করি আপনিও যা বলার সরাসরি বলবেন।
    আমি হাসলাম। আমার সেই বিখ্যাত বিভ্রান্ত করা হাসি। তবে এই মেয়ে শক্ত মেয়ে। সে বিভ্রান্ত হলো না। শুধু তার চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো।
    বাবা আপনার খোঁজ কোথায় পেয়েছেন বলুন তো?
    আমি জানি না।
    জানার ইচ্ছাও হয় নি?
    জি না। আমার কৌতুহল কম।
    আপনাকে নিষ্পাপ লোক খুঁজতে বলা হলো, আপনি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন?
    আমি কাউকে না বলতে পারি না। আপনি যদি আমাকে কিছু করতে বলেন তাও হাসিমুখে করে দেব।
    আপনাকে দিয়ে কোনো কিছু করানোর আগ্রহই আমার নেই। তবে ছোট্ট একটা বক্ততা দেয়ার আগ্রহ আছে। মন দিয়ে শুনুন।
    জি, আমি মন দিয়েই শুনছি।
    বড় রকমের বিপদে পড়লে মানুষ আধ্যাত্মিকতার দিকে ঝুঁকে যায়। তখন শুরু হয় তন্ত্র, মন্ত্র, তাবিজ, ঝাড়ফুঁক। অর্থহীন সব ব্যাপার।
    আপনি এইসব বিশ্বাস করেন না?
    কোনো বুদ্ধিমান মানুষই এইসব বিশ্বাস করে না। আমি নিজেকে একজন বুদ্ধিমতী মেয়ে মনে করি।
    কিছু কিছু ব্যাপার কিন্তু আছে। আমি অনেককেই দেখেছি ভবিষ্যৎ বলতে পারে।
    ভবিষ্যৎ বলতে পারে এমন কাউকে আপনি দেখেন নি। আপনি হয়তো শুনেছেন। ভবিষ্যৎ এখনো ঘটে নি। যা ঘটে নি তা আপনি দেখবেন কী করে?
    করিম বলে একটা লোক আছে। সে হারানো মানুষ খুঁজে বেড়ায়। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ বসে থাকে। তারপর চোখ মেলে বলে দেয় হারানো মানুষটা কোথায় আছে। আমার নিজের চোখে দেখা। আপনি চাইলে আপনাকেও নিয়ে দেখাতে পারি।
    প্লিজ, বাজে কথা বলবেন না।
    আমি নিজেও মাঝে মাঝে ভবিষ্যৎ বলি।
    I see. আমিও সে রকম ধারণা করেছিলাম। কী ধরনের ভবিষ্যৎ আপনি বলেন?
    আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, এক্ষুণি একটা ভবিষ্যতদ্বাণী করে যাই। আগামী এক-দুদিনের ভেতর ঢাকা শহরে একটা ভূমিকম্প হবে।
    ভূমিকম্প?
    জি ভূমিকম্প। বড় কিছু না, ছোটখাটো। সামান্য ঝাঁকুনি।
    মেয়েটির মুখে একটা ধারালো হাসি তৈরি হতে হতে হলো না। আমি মেয়েটির সংযমের প্রশংসা করলাম। অন্য যে কেউ আমাকে কঠিন কথা শুনিয়ে দিত।
    আজ উঠি, না আরো কিছু বলবেন?
    না, আর কিছু বলব না।
    আমি উঠে দাঁড়ালাম। মেয়েটি আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল, আসুন আপনাকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দেই। গাড়ি আছে—গাড়ি আপনাকে পৌঁছে দেবে।
    জি আচ্ছা। আপনার অনেক মেহেরবানি।
  • এসি বসানো স্টেশন ওয়াগন। ভেলভেটের নরম সিট কভার। এয়ারফ্রেশার আছে। গাড়ির ভেতরে মিষ্টি বকুল ফুলের গন্ধ। জানালায় কী সুন্দর পর্দা! গাড়ি যে চলছে তাও বোঝা যাচ্ছে না। আরামে ঘুম এসে যাচ্ছে। এক কাপ চা পাওয়া গেলে হতো। চা খেতে যাওয়া যেত। চা এবং চায়ের সঙ্গে সিগারেট। চা গাড়িতে নেই, তবে পাঞ্জাবির পকেটে সিগারেট আছে। আমি সিগারেটের জন্যে পকেটে হাত দিতেই গাড়ির ড্রাইভার বিরক্ত স্বরে বলল, গাড়ির মইধ্যে সিগ্রেট ধরাইবেন না। গাড়ি গন্ধ হইব।
    আমি ড্রাইভারের কথা অগ্রাহ্য করলাম। পৃথিবীর সব কথা শুনতে নেই। কিছু কিছু কথা অগ্রাহ্য করতে হয়।
    সিগ্রেট ফেলেন।
    এ তো দেখি রীতিমতো ধমক। আর্শ্চয! গাড়ির ড্রাইভার আমাকে দেখেই বুঝে ফেলেছে আমি গাড়ি-চড়া মানুষ নই। রাস্তার মানুষ। আমাকে ধমকালে ক্ষতি নেই।
    কী হইল, কথা কানে যায় না? সিগ্রেট ফেলতে কইলাম না?
    আমি শান্তস্বরে বললাম, তুমি সাবধানে গাড়ি চালাও। বারবার পেছনে তাকিও না। অ্যাকসিডেন্ট হবে।
    সিগ্রেট ফেলেন।
    আমি সিগারেট ফেলে দিলে তোমার আরো ক্ষতি হবে। তখন তুমি আফসোস করবে। বলবে, হায় হায়, কেন সিগারেট ফেলতে বললাম!
    ফেলেন সিগ্রেট।
    আচ্ছা যাও, ফেলছি।
    আমি সিগারেট ফেলে দিলাম। তবে ফেললাম আমার পাশের টকটকে লাল রঙের ভেলভেটের সিট কভারে। দেখতে দেখতে ভেলভেট পুড়তে শুরু করল।
    বিকট গন্ধ বেরুল।
    হতভম্ব ড্রাইভার গাড়ি থামাল। সে দরজা খুলে বেরুতে বেরুতে সিটের অর্ধেকটা পুড়ে ছাই। ড্রাইভার বিস্মিত হয়ে তাকাচ্ছে। আমি তার দিকে তাকাচ্ছি হাসিমুখে। ড্রাইভার ক্লান্ত গলায় বলল, এইটা কী করলেন?
    আমি সহজ গলায় বললাম, মন খারাপ করবে না। এই পৃথিবীর সবই নশ্বর। একমাত্র পরম প্রকৃতিই অবিনশ্বর। তিনি ছাড়া সবই ধব্বংস হবে। ভেলভেটের সিট কভার অতি তুচ্ছ বিষয়। গাড়িটা এক সাইডে পার্ক করো। এসো, চা খাও। চা খেলে তোমার হতভম্ব ভাবটা দূর হবে।
    ড্রাইভার আমার সঙ্গে চা খেতে এলো। তাকে এখন আর মানুষ বলে মনে হচ্ছে না। বোধশক্তিহীন ‘জম্বির’ মতো দেখাচ্ছে।
    ন-দশ বছরের একটা রোগা ছেলে ফ্লাস্কে চা নিয়ে বসে আছে। ছেলেটির পাশে তার ছোট দুই বোন। চা চাইতেই ছোট মেয়েটি হাসিমুখে দুটা কাপ ধুতে শরু করল। বড় বোন সেই ধোয়া কাপ আবার নতুন করে ধুল। ভাই চা ঢালল। তিনজনের টি-স্টল।
    ড্রাইভার চুকচুক করে চা খাচ্ছে। আড়ে আড়ে তাকাচ্ছে আমার দিকে। আমাকে বুঝতে চেষ্টা করছে। নিজেকে বোঝা নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আমাদের প্রধান চেষ্টা অন্যকে বোঝা।
    চা কত হয়েছে রে?
    ছোট মেয়েটি হাসিমুখে বলল, দুই টেকা। আমি সদ্য পাওয়া চকচকে পাঁচ শ টাকার নোটটা তার হাতে দিলাম। সে আতঙ্কিত গলায় বলল, ভাংতি নাই।
    আমি সহজস্বরে বললাম, ভাংতি দিতে হবে না, রেখে দাও। মেয়েটা যতটা না বিস্মিত হয়েছে ড্রাইভার তারচেয়েও বিস্মিত। তার মুখ হাঁ হয়েছে। চোখে পলক পড়েছে না। আমি বললাম, ড্রাইভার, তুমি গাড়ি নিয়ে চলে যাও। আমি হেঁটে হেঁটে বাসায় ফিরব। সিট কভার পোড়া নিয়ে কেউ যদি কিছু বলে—আমার কথা বলবে।
    ড্রাইভার কোনো কথা বলছে না। এখনো পলকহীন চোখে তাকিয়ে আছে। পলকহীন চোখে মানুষের তাকানো উচিত নয়। পলকহীন চোখে তাকায় সাপ আর মাছ। তাদের চোখের পাতা নেই। মানুষ সাপ নয়, মাছও নয়। তাকে পলক ফেলতে হয়।
    আমি এগোচ্ছি। মনে মনে ভাবছি, এমন যদি হতো—ড্রাইভার তার গাড়ির কাছে ফিরে গিয়ে দেখে ভেলভেটের সিট কভার আগের মতোই আছে। সেখানে কোনো পোড়া দাগ নেই, তাহলে ড্রাইভারের মনোজগতে কী প্রচণ্ড পরিবর্তনই না হতো! কিন্তু তা সম্ভব নয়। আমি কোনো মহাপরুষ নই। আমার কোনো অলৌকিক ক্ষমতা নেই। আমি হিমু। অতি সাধারণ হিমু
    তবে অতি সাধারণ হিমু হলেও মাঝে মাঝে আমার কিছু কথা লেগে যায়। অন্যদেরও নিশ্চয়ই লাগে। অন্যরা লক্ষ করে না, আমি করি। ভূমিকম্পের কথা বলাটা অবশ্যি বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। মনে এসেছে, বলে ফেলেছি।
  • দুপুরের খাওয়া হয় নি। খিদে জানান দিচ্ছে। আমি নিয়ম মেনে চলি না। কিন্তু আমার শরীর নিয়মের শৃঙ্খলে বাঁধা। যথাসময়ে তার ক্ষুধা-তৃষ্ণা হয়। ক্ষুধা-তৃষ্ণা জয় করার নিয়মকানুন জানা থাকলে হতো। বিজ্ঞান এই দুটি জিনিস জয় করার চেষ্টা কেন করছে না? আমার চেনা একজন আছে যে তৃষ্ণা জয় করেছে। গত তিন বছরে সে এক ফোঁটা পানি খায় নি। তার নাম একলেমুর মিয়া। সে ফার্ম গেটে তার মেয়েকে নিয়ে ভিক্ষা করে। আমার সঙ্গে ভালো খাতির আছে। আজ দুপুরে খাওয়া তার সঙ্গে খাওয়া যায়। বড় খালার বাড়িতেও যেতে পারি। কিংবা রূপাদের বাড়ি। তবে রূপার বাড়িতে থাকার সম্ভাবনা খুব কম। সে কী একটা বই লিখেছে। সকালে উঠে জয়দেবপুরের বাড়িতে চলে যায়। রাতে ফেরে। সেখানে টেলিফোন নেই। ঢাকার বাসায় খোঁজ নিয়ে দেখা যেতে পারে।
    চট করে কোনো দোকান থেকে টেলিফোন করা এখন আর আগের মতো সহজ নয়। টেলিফোন করতে টাকা লাগে। আগে যে-কোনো দোকানে ঢুকে করুণ মুখে বললেই হতো—ভাই, একটা টেলিফোন করব।
    এখন টেলিফোনের কথা বলার আগে কাউন্টারে পাঁচটা টাকা রাখতে হয়।
    বিনা টাকায় টেলিফোন করা যায় কিনা না সেই চেষ্টা করা যেতে পারে। নতুন কোনো টেকনিক বের করতে হবে। এমন টেকনিক যা আগে ব্যবহার করা হয় নি। ভিক্ষার জন্যে যেমন প্রতিনিয়ত নতুন নতুন টেকনিক বের করতে হয়—ফ্রি টেলিফোনের জন্যেও হয়। আমি এক টুকরো কাগজ নিয়ে লিখলাম—
    ভাই,
    আমার বান্ধবীকে খুব জরুরি একটা টেলিফোন করা
    দরকার। সঙ্গে টাকা-পয়সা নেই বলে লজ্জায় মুখ ফুটে বলতে
    পারছি না।
    বিনীত
    হিমু
    কাগজের টুকরো হাতে নিয়ে একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ঢুকে পড়লাম। সেলসম্যানকে কাগজটা পড়তে দিলাম। সে পড়ল, খানিকক্ষণ বিস্মিত চোখে আমাকে দেখে টেলিফোন সেট আমার দিকে এগিয়ে দিল।
    হ্যালো, আমি হিমু
    চিনতে পারছি।
    কেমন আছ রূপা?
    ভালো।
    আজ জয়দেবপুর যাও নি?
    না, কিছুক্ষণের মধ্যে রওণা হব!
    আচ্ছা, তোমাদের জয়দেবপুরের বাড়িটা কেমন?
    খুব সুন্দর বাড়ি।
    কী রকম সুন্দর বল তো?
    কেন?
    আহা বলো না।
    বললে তুমি কি যাবে আমার সঙ্গে?
    যেতে পারি।
    সাত একর জমি নিয়ে গ্রামের ভেতর খামারবাড়ি কিংবা বলতে পারো খামার হাউস। বাড়ির পেছনে পুকুর আছে। পুকুর বড় না, ছোট্ট পুকুর। কিন্তু মার্বেল পাথরে বাঁধানো ঘাট। সেই ঘাটে নৌকা বাঁধা আছে। বাড়িটা চারদিক দিয়ে গাছপালায় ঘেরা।
    বাড়ির ছাদ আছে? ছাদে বসে জোছনা দেখা যায়?
    ছাদে বসে জোছনা দেখার ব্যবস্থা নেই। টালির ছাদ।
    বাংলো বাড়ি?
    হ্যাঁ, বাংলো বাড়ি। যাবে আমার সঙ্গে?
    ভাবছি।
    তুমি কোথায় আছ বলো, আমি তোমাকে তুলে নিয়ে যাব।
    আমি দ্রুত চিন্তা করছি। রূপার সঙ্গে নির্জন বাংলো বাড়িতে পুরো একটা দিন থাকার লোভ জয় করতে হবে। যে করেই হোক করতে হবে। শরীরের উপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, কিন্তু মনের উপর তো আছে…
    হ্যালো—বলো তুমি কোথায় আছ?
    শোন রূপা। জরুরি কিছু খবর আমাকে এখন লোকজনদের দিয়ে বেড়াতে হবে। নয়তো যেতাম।
    কী জরুরি খবর?
    কাল-পরশুর মধ্যে ভূমিকম্প হবে—এই খবর। যদিও তা হবে ছোট সাইজের, তবুও তো ভূমিকম্প।
    তুমি আমার সঙ্গে কোথাও যাবে না সেটা বলো—ভূমিকম্পের অজুহাত তৈরি করলে কেন?
    অজুহাত না, সত্যি।
    তুমি বলতে চাচ্ছ ভূমিকম্পের ব্যাপারে তুমি আগে জেনে ফেলেছে?
    হুঁ।
    তোমার এই এই…
    রূপা কথা পাচ্ছে না। রাগে তার চিন্তা এলোমেলো হয়ে গেছে।
    আমি বললাম, টেলিফোন রাখি রূপা? এখন তোমাদের বাংলো বাড়িতে গিয়ে লাভ হবে না। দিন-তারিখ দেখে যেতে হবে—পূর্ণিমা দেখে। নেক্সট পূর্ণিমায় যাব। অবশ্যেই যাব, রাখি কেমন?
    আমি টেলিফোন নামিয়ে বের হয়ে এলাম। পাশের একটা দোকানে ঢুকলাম। কাগজের টুকরোটা কতটুকু কাজ করে দেখা দরকার। মনে হচ্ছে ভালো ব্যবস্থা।
    এই দোকানটার সেলসম্যান কিংবা মালিক আগের দোকানটার মতো চট করে রিসিভার এগিয়ে দিলেন। ভূরু কুঁচকে কাগজটা দেখতে দেখতে বললেন, আপনি কথা বলতে পারেন না?
    আমি হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লাম।
    কথা বলতে পারেন তাহলে কাগজে লিখে এনেছেন কেন? এই ঢং করার দরকার কী?
    আমি হাসলাম। মধুর ভঙ্গির হাসি। ভদ্রলোকের ভূরু আরো কুচঁকে গেল।
    বুঝলেন হিমু, যা করবেন স্ট্রেইট করবেন। বাঁকা পথে করবেন না। ‘ছিরাতুল মুস্তাকিম’—সরল পথ। কোথায় আছে বলেন দেখি?
    সূরা ফাতেহা।
    গুড। নিন টেলিফোন,যত ইচ্ছা বান্ধবীর সঙ্গে গল্প করুন।আবার যখন দরকার হবে চলে আসবেন। স্লিপ ছিঁড়ে ফেলে দিন। আমার সামনেই ছিঁড়ুন।

    হিমু সমগ্র / সিরিজ 

    ময়ূরাক্ষী -হুমায়ূন আহমেদ

    আঙুল কাটা জগলু -হুমায়ূন আহমেদ

    আজ হিমুর বিয়ে -হুমায়ুন আহমেদ

    একজন হিমু কয়েকটি ঝিঁঝিঁ পোকা -হুমায়ুন আহমেদ

    এবং হিমু -হুমায়ুন আহমেদ

    চলে যায় বসন্তের দিন -হুমায়ুন আহমেদ

    তোমাদের এই নগরে -হুমায়ুন আহমেদ

    দরজার ওপাশে -হুমায়ুন আহমেদ

    পারাপার -হুমায়ুন আহমেদ

    সে আসে ধীরে -হুমায়ুন আহমেদ

    হলুদ হিমু কালো র‍্যাব -হুমায়ুন আহমেদ

    হিমু এবং একটি রাশিয়ান পরী – হুমায়ুন আহমেদ

    হিমু এবং হার্ভার্ড Ph.D. বল্টুভাই -হুমায়ুন আহমেদ

    হিমু মামা – হুমায়ুন আহমেদ

    হিমু রিমান্ডে -হুমায়ুন আহমেদ

    হিমু -হুমায়ুন আহমেদ

    হিমুর আছে জল -হুমায়ুন আহমেদ

    হিমুর দ্বিতীয় প্রহর -হুমায়ুন আহমেদ

    হিমুর নীল জোছনা -হুমায়ুন আহমেদ

    হিমুর মধ্যদুপুর – হুমায়ুন আহমেদ

    হিমুর রূপালী রাত্রি -হুমায়ুন আহমেদ

    হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম -হুমায়ুন আহমেদ

    আশা করি হুমায়ূন আহমেদ এর হিমু সমগ্র / সিরিজ এর গল্পের বই গুলো হবে আপনাদের অবসর সময়ের সঙ্গি। আমাদের ওয়েব সাইটে হুমায়ূন আহমেদ সহ অনেক প্রসিদ্ধ লেখকের বই পাবেন বিনা মূল্যে। তাই সব সময় আমাদের সাথে থাকুন এবং মজার মজার সব বই পড়ুন।

  • আরও দেখুন

    আপনার মন্তব্য এখানে লিখুন

    আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।